রাজনীতি

হেফাজতের নেতৃত্ব নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

  Mahbub ২৭ আগস্ট ২০২১ , ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কোন গ্রুপের হাতে যাচ্ছে-এই প্রশ্ন এখন অনেকের মধ্যে।

সম্প্রতি সংগঠনটির আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এখন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী। তার নেতৃত্বেই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারীরা।

তবে বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফীপন্থিরা। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সামনে সংগঠনটির শূরা বৈঠক হবে। ওই বৈঠকেই নির্ধারণ হবে হেফাজতে ইসলামের পরবর্তী নেতা কে হচ্ছেন।

সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় তিন নেতা ইন্তেকাল করেছেন। এটি অপূরণীয় ক্ষতি। তবে এ শূন্যতার কারণে সংগঠনের কার্যক্রম থেমে থাকবে না। যারা বেঁচে আছেন তাদের নিয়েই হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম চলবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের শূরা সদস্যদের মতামত নিয়েই আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে আমির ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত তিনি হেফাজতে ইসলামের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।’

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদরীস জানান, হেফাজতের সিনিয়র নেতা ও দেশের শীর্ষ আলমদের মতামতের ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র মোতাবেক কেউ আমির নির্বাচিত হবেন। এজন্য আমাদেরকে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে পরবর্তী আমির নির্বাচন করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৩ দফা দাবি নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম। নানা ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন সংগঠনটির নেতা আল্লামা আহমদ শফী, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং আল্লামা নূর হোসেন কাসেমী। গত এক বছরে এই তিন নেতার মৃত্যু হয়েছে। ফলে সংগঠনটিতে নেতৃত্বশূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের সাবেক এক নায়েবে আমির জানান, আমিরের দায়িত্ব পাওয়া মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সম্পর্কে জুনাইদ বাবুনগরীর মামা। তিনি হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সিনিয়র নায়েবে আমির ছিলেন। পরে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি মিললে আল্লামা শফীর ঢাকায় শোকরানা মাহফিলের আয়োজনের বিরোধিতা করে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। যদিও তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছিল কি-না তা কখনোই স্পষ্ট করেননি আল্লামা শফী। গত বছর সেপ্টেম্বরে তার মৃত্যুর পর নভেম্বরের কাউন্সিলে প্রধান উপদেষ্টা হন মুহিবল্লাহ বাবুনগরী।

জানা যায়, জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর দিন রাতে সংগঠনটির বর্তমান মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদি মজলিসে শূরার সদস্যদের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী নাম আমির (ভারপ্রাপ্ত) হিসাবে ঘোষণা করেন। এই আমিরের নেতৃত্বে সংগঠনটি ঘুরে দাঁড়াবে; নাকি অস্তিত্বের সংকটে পড়বে-এই প্রশ্নই এখন প্রয়াত জুনায়েদ বাবুনগরীপন্থি নেতাকর্মীদের মধ্যে।

সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আল্লামা শফীপন্থিরা বেশ সরব রয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন জানিয়ে শফীপন্থী হেফাজতের সাবেক এক নেতা বলেন, শ্রদ্ধেয় আল্লামা শফী গত বছরের সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ার পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় ‘অবৈধ’ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে আমির নির্বাচিত হন জুনায়েদ বাবুনগরী, আর মহাসচিব হন নূর হোসাইন কাসেমী।

এরপর আমির ও মহাসচিবের বলয়ের লোকজন একচেটিয়া কমিটিতে জায়গা পান। এতে আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে থাকাদের বাদ দেওয়া হয়। এ কারণে হেফাজতের একাংশের নেতাকর্মীরা ওই কমিটিকে ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ বলে আখ্যায়িত করেন। পরবর্তীতে শফীপন্থিরা বিকল্প কমিটি করবেন ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।

হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মইনুদ্দিন রুহি জানান, ভারপ্রাপ্ত আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর চট্টগ্রামের বাইরে তেমন প্রভাব নেই। কখনো ছিলও না। তার চেয়ে সংগঠনে আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদীর প্রভাব অনেক বেশি। শুধু সাবেক আমিরের আত্মীয় হওয়ার কারণে মহিবুল্লাহ বাবুনগরী ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পেয়েছেন।

হেফাজতের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, হাটহাজারী মাদ্রাসা হেফাজতের সদর দপ্তর হিসাবে পরিচিত। ওই মাদ্রাসার শীর্ষ পর্যায়ের আলেমরাই হেফাজতের আমির নির্বাচনে প্রাধান্য পান। সে হিসাবে মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য মুফতি আবদুস সালামের হেফাজতের পরবর্তী আমির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া সংগঠনটির নায়েবে আমির পদে থাকা মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আহমদ ও মাওলানা ইয়াহহিয়া এবং সিনিয়র শিক্ষক মুফতি জসিম উদ্দিনকেও আমির পদে দেখা যেতে পারে। আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংগঠনটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হাটহাজারী মাদ্রাসার সিনিয়র মুরব্বিদের মধ্যে যে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বছরের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় মাঠে নামে জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজত। এ সময় দেশের কয়েকটি স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটে। এরপরই সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। গ্রেফতার হতে থাকে একের পর এক নেতা। এক পর্যায়ে কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন বাবুনগরী। গত ৭ জুন তার নেতৃত্বে হেফাজতের ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি হয়।