ইসলাম প্রতিদিন

যৌবন হেফাজতের গুরুত্ব নিয়ে ইসলাম যা বলে

  Mahbub ২৪ আগস্ট ২০২১ , ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

আলেমা মারিসা ইসলাম মীম


দুনিয়ার জীবনই সব কিছু নয়। দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের শস্য ক্ষেত। এখানে যে যা করবেন তারই ফল পাবেন আখিরাতে। দুনিয়ার জীবনে সবকাজের ক্ষেত্রে যুবকদের ভূমিকা অপরিসীম। সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ, ইসলামের প্রচার-প্রসার, ইবাদত-বন্দেগি কিংবা যে কোনো দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে যুবকদের বিকল্প নেই। ব্যক্তি পরিবার ও সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুবকদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার।

মানুষের জন্য যৌবনকাল হচ্ছে জীবনকে সাজিয়ে নেয়ার সবচেয়ে কার্যকর সময়। কারণ মানুষ ছোটবেলায় যেমন দুর্বল থাকে তেমনি বৃদ্ধ বয়সেও সে দুর্বল হয়ে যায়। সব কাজের জন্য যৌবনকালই শ্রেষ্ঠ সময়। সে জন্যই আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.) যৌবনকালকে প্রাধান্য দিয়ে বলেছেন-

‘পাঁচটি বিষয়কে অন্য পাঁচটি বিষয়ের আগে মূল্যবান ভেবে কাজ সেরে নাও। তাহলো- ‘বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকালকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতার সময়কে, দারিদ্যে পড়ার আগে প্রাচুর্যকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে আর মৃত্যু আসার আগে তোমার জীবনকে মর্যাদা দাও।’ -মুসতাদরাকে হাকেম

যৌবনকালের গুরুত্ব কত বেশি তা হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রাহ.) কথা থেকেই প্রমাণিত। তিনি বলতেন-‘যৌবনকাল হলো এমন এক বস্তু যা হাতের তালুতে রাখা ছিল কিন্তু পড়ে গেল। ইবাদতে সময় দেওয়ার উপযুক্ত কাল হচ্ছে তোমার যৌবকন কালের দিনগুলো। তুমি কি জান; যৌবনের দিনগুলো তোমার কাছে আগত মেহমানের মতো! খুব দ্রুত তা তোমার কাছ থেকে বিদায় নেবে। আর তাই যা করার তা যদি এখনি না কর, তবে অনুশোচনা তোমাকে দীর্ঘদিন দগ্ধ করবে।’

একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, স্থান-কাল নির্বিশেষে বিশ্বমানবতার উৎকর্ষ সাধনে যৌবনকালের বিকল্প নেই। যে কোনো জাতির উত্থান-পতন, জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, উন্নতি অগ্রগতি ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে যুবকরাই মূল শক্তি। যুবকদের উপরই নির্ভর করে দেশ ও জাতি, ধর্ম-বর্ণের উজ্জ্বল ভবিষ্যত। হাদিসের এ বর্ণনাগুলো তা-ই স্মরণ করিয়ে দেয়-

যুবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলঃ-
যুবকরা নিজেদের জীবনের প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অনুধাবন করে সচেতন হবে। দুনিয়া ও পরকালে সাফল্য লাভে ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত এবং ইসলামের চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে। নিজেদের জীবনে বে-দ্বীন আচরণ ও পাপাচার থেকে মুক্ত হয়ে কথা-কাজ ও আমলে সৎ, সরল, কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

এজন্য যুবকদের একাগ্রচিত্তে নিষ্ঠার সঙ্গে কোরআন-সুন্নাহ যথাযথ আমল বাস্তবায়নে আদর্শবান মুসলিম যুবকদের ইতিহাস জেনে তা অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে। ইসলামের জন্য বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কালজয়ী আদর্শ বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ হতে হবে। তবেই সাফল্যমণ্ডিত হবে যুবকের যৌবনের সব কাজ ও আমল।

মুসলিম যুবকদের মূলশক্তি হলো- তাদের ঈমানি চেতনা, শরীয়তের পুরোপুরি অনুশীলন ও দ্বীনী ইলম শিক্ষার অদম্য স্পৃহা। ইসলামের দ্রুত উন্নতির কারণও এটা। তবে দুটি বিশেষ কারণে যুবকের যৌবনের সোনালী সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কুলষিত হতে পারে যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। যা থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরি। তাহলো-

১. জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকালঃ-
শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের সমন্বয়ে মানুষের জীবন। যৌবনকাল এর মধ্যে সেরা। কোরআনের নির্দেশনায় তা ওঠে এসেছে এভাবে-

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً يَخْلُقُ مَا يَشَاء وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ
আল্লাহ তিনি দূর্বল (শিশু) অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন অতঃপর দূর্বলতার পর (যৌবনে) শক্তিদান করেছেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’
_________________________(সুা রূম : আয়াত ৫৪)

২. আসহাবে কাহফের ব্যক্তিরাও যুবকঃ-
এ ঘটনার মূলে রয়েছে কয়েকজন যুবক। ঈমানদার যুবকদের শিক্ষার নিমিত্তে সুরাতুল কাহফে তাদের ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তোমাকে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’

_________________________(সুরা কাহফ : আয়াত ১৩)

৩. যৌবনে হজরত ইবরাহিমঃ-
মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। যৌবনে ছোট্ট এক ঘটনার মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন পুরো ব্যাবিলনে। মূর্তি ভেঙে পুরো পৌত্তলিক সমাজব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তাওহিদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আওয়াজ ওঠল, কে করেছে এই কাজ, কার এত বড় সাহস? কোরআনে বর্ণনায়-‘তাদের কেউ কেউ বলল, আমরা শুনেছি এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে। তাকে বলা হয় ইবরাহিম।’

____________________________(সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৬০)

৪. যৌবনে হজরত ইউসুফঃ-
ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার সৌন্দর্য ও চরিত্র সংরক্ষণের জন্য এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর যুবকদের কাছে অনুপম ও অনুকরণীয় আদর্শ। কোরআন সেই ঘটনা তুলে ধরেছে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে। তাহলো- ‘তাদের কাহিনীর মধ্যে বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।

______________________’ (সুরা ইউসুফ : আয়াত ১১১)

৫. যৌবনে হজরত মারিয়ামঃ-
হজরত মারিয়াম (আলা.) এর নামে একটি সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘মারিয়াম’ নামে। তিনি ছিলেন একজন যুবতী। কুরআনে এসেছে- ‘আর স্মরণ করো এই কিতাবে উল্লিখিত মারিয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে নিরালায় পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিলো।’

___________________________(সুরা মারিয়াম : ১৬)

৬. হজরত মুসার আহ্বানে যুবকদের সাড়াঃ-
হজরত মুসা (আলা.) এর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন সে সময়ের যুবকরা। যেই যুবকরা ফি}}রা}}উ}}নের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিছু সাহসী মানুষ মুসা আলাইহিস সালামের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তারাও ছিলেন যুবক। যাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু মুসার প্রতি তার কওমের ক্ষুদ্র একটি দল ছাড়া কেউ ঈমান আনল না, এ ভয়ে যে, ফি}}রা}}উ}}ন ও তাদের পরিষদ তাদেরকে ফেতনায় ফেলবে।’

________________________ (সুরা ইউনুছ : আয়াত ৮৩)

৭. হজরত মুসার সঙ্গীও ছিল যুবকঃ-
আল্লাহর আদেশে হজরত মুসা (আলা.) খিদির আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন ইউশা বিন নুন (আলা.)কে। তিনিও ছিলেন যুবক। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ কর, যখন মুসা তার সহচর যুবকটিকে বলল, আমি চলতে থাকব যতক্ষণ না দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে উপনীত হবো কিংবা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেব।’

___________(সুরা কাহফ : আয়াত ৬০)

৮. যুবক হজরত ইয়াহইয়াঃ-
হজরত ইয়াহইয়া (আলা.) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও একজন কিশোরের বিষয়ে বলেন, ‘হে ইয়াহিয়া, তুমি কিতাবটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো’ আমরা তাকে শৈশবেই প্রজ্ঞা দান করেছি। আর আমাদের পক্ষ থেকে তাকে স্নেহ-মমতা ও পবিত্রতা দান করেছি এবং সে মুত্তাকি ছিল।’

_________(সুরা মারিয়াম : আয়াত ১২-১৩)

এ ছাড়াও হজরত দাউদ (আলা.) ও তালুতের ঘটনা উল্লেখ করার মতো। ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ও যুবকরা অগ্রাধিকারী। ইসলামের একেবারে প্রথম দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কিশোর ও যুবক। প্রসিদ্ধ সাহাবিগণ ১০ থেকে ৩৭ বছর বয়সের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও বয়সের ব্যাপারটা ঐতিহাসিকদের মতে কমবেশি হতে পারে।

যৌবনকাল এমন এক বয়স; যে বয়সে মানুষ জীবনের উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম। দুনিয়া কিংবা আখেরাতের জীবনের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে যৌবন বয়সের গুরুত্ব অনুধাবন করে জীবনের প্রতিটি ধাপে যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সফলতা লাভ করার তৌফিক দান করুক। আমীন।