কওমী বার্তা

মুক্তিযুদ্ধের পাঠ হোক কওমি মাদ্রাসায়

  Mahbub ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ , ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত ৫০ বছরেও কওমি মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানোর কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে কওমি মাদ্রাসার সব শ্রেণিতে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনকে পাঠ্য করেছে জাতীয় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ।

এ ঐতিহাসিক কাজটির মূল উদ্যোক্তা হলেন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক ও জাতীয় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশের শিক্ষা গবেষণা ও সিলেবাস পরিচালক সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এতদিন কেন কওমি মাদ্রাসায় পড়ানো হয়নি? কেনইবা পড়ানো জরুরি ইত্যাদি বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন-তোফায়েল গাজালি

-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এতদিন কেন পড়ানো হয়নি কওমি মাদ্রাসায়?

সৈয়দ আনোয়ার : এটি একটি বড় প্রশ্ন। আমরা যারা একাত্তরপরবর্তী প্রজন্ম কওমি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছি বিষয়টি আমাদের পীড়া দিত। দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় কোমলমতি শিশুদের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে নেই কোনো পাঠপরিকল্পনা ও পাঠ্যসূচি। যা একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে আমাদের চরমভাবে হতাশ করে।

কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থীর বিগত অর্ধশত বছরেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর কোনো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হয়তো কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের প্রবক্তারা বয়োবৃদ্ধ এবং পাকিস্তান আমলের লোক ছিলেন বয়েসের দিক দিয়ে, তাই তারা বিষয়টি সেভাবে অনুভব করেননি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এ দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের সঙ্গে অসংখ্য আলেম ওলামা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আজকের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এসব আলেমের নামও জানে না। এটি দুঃখ ও লজ্জার কথা।

-আপনারা বিষয়টি কীভাবে তুলে ধরেছেন?

সৈয়দ আনোয়ার : আমরা ২০২০-২১ সালে এ উদ্যোগটি গ্রহণ করি। যেহেতু সরকারি কোনো উদ্যোগ এ বিষয়ে এখনো নেওয়া হয়নি এবং কওমি মাদ্রাসার বোর্ডগুলো এ নিয়ে কোনো চিন্তা করছে না। আমরা একাত্তরপরবর্তী প্রজন্ম হিসাবে মনে করেছি এটি নিয়ে আর অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছোট্ট পরিসরে হলেও কাজটি শুরু করা দরকার।

লেখালেখি সম্পন্ন করে পাঠ্যবই ছাপিয়ে কওমি মাদ্রাসার শিশুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যদিও এটি অনেক কঠিন ও ব্যয়বহুল চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ ছিল। তবুও আমরা দমে যাইনি এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি। আমরা প্রথমত সব ক্লাসের বাংলা বইয়ে ও সাধারণ জ্ঞানে মুক্তিযুদ্ধের একাধিক পাঠ তৈরি করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি যেন সঠিক ইতিহাস শিশুরা জানতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধ, ৭ মার্চের ভাষণ, ৬ দফা, ৬৯-এর গণআন্দোলন ও ৫২’র একুশের কথা সেসব পাঠে স্থান পেয়েছে। যা আরমাত্র কয়েকদিন পরই প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২২ সালের শিক্ষাবর্ষে আমাদের পরিচালিত সারা দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত ৫ শতাধিক কওমি মাদ্রাসার ১ লাখ ১১ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন কওমি মাদ্রাসায় পাঠ করা জরুরি বলে মনে করেন?

সৈয়দ আনোয়ার : মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী বন্ধু হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন, ব্রিটিশ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ফেদায়ে মিল্লাত সৈয়দ আসআদ মাদানি (রহ.)। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের পাশাপাশি আসআদ মাদনি (রহ.) ছিলেন ৭১ সালে এ দেশের আলেমদের প্রেরণার উৎস। তার কারণেই মূলত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ অনেক আলেম সমাজ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে তখন অংশ নিয়েছিলেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো কওমি মাদ্রাসায় এ নিয়ে কোনো ইতিহাস পড়ানো হয় না। নিজের আত্মপরিচয় না জানা কোনো জাতি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সে নজির ইতিহাসে নেই। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে দ্বীন-ধর্ম ও ইমান ইসলাম নিয়ে সুন্দরভাবে বসবাসের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন অপরিহার্য। সে জন্য মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠদান করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।

-আপনি এ বিষয় নিয়ে কাজ করার আগ্রহ কোথা থেকে পেলেন?

সৈয়দ আনোয়ার : এ নিয়ে আমার কাজ করার মূল প্রেরণা আমার আব্বা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বঙ্গবন্ধু গবেষক ইতিহাসবিদ সৈয়দ আব্দুল্লাহ। তিনি এখন ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তার লেখা ইতিহাসের বই ‘সিলেটে বঙ্গবন্ধু’ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনন্য দলিল গ্রন্থ। আমাদের পরিবারের আলেমরা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর রাজনৈতিক নেতা ছিলেন।

এরা ছিলেন ৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কট্টর বিরোধী ও অখণ্ড ভারতের পক্ষের লোক ছিলেন এবং পরবর্তীতে ৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন।

-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই?

সৈয়দ আনোয়ার : আমি আশা করি সব কাওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে এখন এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং সরকারিভাবে যেন এ বিষয়টি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা হয়, আমি এ প্রত্যাশা রাখি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায়। এখন এটি বাস্তবায়িত না হলে একটি আফসোসের কারণ থাকবে। কোনো একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বাস্তবমুখী কর্মবান্ধব যুগোপযোগী শিক্ষা ও দেশপ্রেমের চেতনা থেকে বঞ্চিত রেখে একটি দেশের টেকসই ফলপ্রসূ উন্নয়ন আদৌ সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।

আরও খবর:

এজাতীয় আরও খবর