জাতীয়

মাদরাসায় ঢুকে ছাত্র-শিক্ষকসহ ৬ জনকে হত্যা

  Mahbub ২৩ অক্টোবর ২০২১ , ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

রাত ৩টা। কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এইচ ব্লকে রাতের নিস্তব্ধতা। ক্যাম্পের ভেতর দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা সবে জেগে উঠতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করছিলেন। এ সময় তিন শতাধিক সন্ত্রাসী দা, কিরিচ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাদরাসায় ঢুকে শিক্ষক ও ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন মাদরাসার তিনজন শিক্ষক, এক শিশু ছাত্র এবং হামলার খবর পেয়ে ছুটে আসা দুই রোহিঙ্গা শরণার্থী। আহত হয়েছেন আরো অন্তত ১০ জন।

মাদরাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে চলে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি দোকান ও বাড়িও ভাঙচুর করে। গতকাল শুক্রবার ভোরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দিনের বেলায় প্রকাশ পায় আসল ঘটনা।

দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদরাসার শিক্ষক ও সাধারণ রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেছেন, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও তাদের অনুসারী সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ঘটনার পর ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার পর একটি দেশীয় বন্দুক, ছয় রাউন্ড গুলি, একটি ছুরিসহ সন্দেহভাজন এক সন্ত্রাসীকে আটক করেছেন তাঁরা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হামলায় নিহতরা হলেন দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল-ইসলামিয়াহর শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ ইদ্রিস (৪০), মসজিদের ইমাম হাফেজ নুর হুালিম (৪৫), শিক্ষক হামিদ উল্লাহ (৫০), মাদরাসাছাত্র ইব্রাহিম হোসেন (২০), স্থানীয় রোহিঙ্গা আজিজুল হক (১৮) ও মোহাম্মদ আমিন (৬৩)।

এদিকে, মাদরাসার পরিচালক দিল মোহাম্মদসহ আরো অন্তত ১০ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উখিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে স্থানীয় রোহিঙ্গারা হামলায় নিহত ও আহত হন। গতকাল সকালে পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথমে জানান, হামলায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁরা নিশ্চিত করেন, সাতজন নয়, মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। গতকাল সকালে ১৮ নম্বর ক্যাম্পের এক ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যা ভুলবশত হামলায় মৃত্যুর সঙ্গে গণনা করা হয়।

এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে রোহিঙ্গাদের নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মহিব উল্লাহকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অর্ধশত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এই গ্রেপ্তারের সঙ্গে গতকালের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে বলেও দাবি করেছেন মাদরাসার শিক্ষকরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সশস্ত্র হামলাকারী রোহিঙ্গারা মাদরাসার ভেতর তাহাজ্জুদের নামাজ ও জিকিরে থাকা দুই শিক্ষককে প্রথমে গুলি এবং পরে রামদা দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। এরপর আরো দুজনকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। হামলায় আহত হয়ে দুজন হাসপাতালে মারা গেছেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, মাদরাসার দাওরা (উচ্চতর শ্রেণি) ছাত্র রহিমুল্লাহ বলেন, গতকাল শুক্রবার ছুটি থাকায় রাতে এশার নামাজের পর সামান্য পড়ালেখা করে ছাত্ররা শুয়ে পড়েছিল। ভোররাত ৩টার দিকে হঠাৎ মাদরাসার পশ্চিম দিক থেকে কয়েক শ লোক  অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাদরাসাটি ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্যে দেড় শতাধিক সন্ত্রাসী মাদরাসা ক্যাম্পাসে ঢুকে টিনশেড মাদরাসায় দা ও কিরিচ দিয়ে প্রথমে হামলা করে। পরে তারা নামাজরত শিক্ষকদের ওপর হামলা করে, গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করে। ছাত্রদের কক্ষে ঢুকে ভাঙচুর করে তাদের ওপরও হামলা চালায়। সেখানে বেশির ভাগ ছিল হেফজ বিভাগের ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু। খবর পেয়ে স্থানীয় অভিভাবকদের অনেকে তাঁদের সন্তানদের উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাঁদের ওপরও হামলা করে সন্ত্রাসীরা। তবে এত বেশিসংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে প্রতিরোধ করতে সাহস করেনি কেউ।

মোহাম্মদ নামের ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, হামলাকারীরা আরসা সন্ত্রাসী। দ্রুত এসে তারা মাদরাসাটি ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা মাদরাসার ভেতরে ঢুকে পড়লেও অন্য সন্ত্রাসীরা বাইরের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা প্রতিরোধের জন্য পাহারায় ছিল।

সন্ত্রাসীরা মাদরাসায় ঢুকেই মওলানা দীন মোহাম্মদ নামের একজনকে খোঁজাখুঁজি করে। মওলানা দীন মোহাম্মদ মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা। ঘটনার সময় তিনি ইবাদতে ছিলেন। হামলাকারীদের মুখে তাঁর নাম শুনেই তিনি কৌশলে পালিয়ে পাশের একটি ঘরে আশ্রয় নেন। হামলাকারীদের প্রত্যেকেরই হাতে বন্দুক, রামদা, ছুরি ও লোহার রড ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

গতকাল দুপুরে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত করার জন্য আনা হয়। সেখানে আনোয়ার নামের এক রোহিঙ্গা শরণার্থী বলেন, সন্ত্রাসীরা শুধু গুলিতে নয়, ধারালো রামদা দিয়ে প্রায় প্রত্যেক রোহিঙ্গার হাত, হাত ও পায়ের আঙুল কেটে দিয়েছে।

হামলায় নিহত রোহিঙ্গা আজিজুল হকের মা সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আজিজ মাদরাসায় ঘটনার খবর শুনে হেফজ বিভাগে পড়ুয়া ভাই নুর কদরকে উদ্ধার করতে ছুটে গিয়েছিল। সেখানে আরসার সদস্যরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। ’

নিহত নুর হালিমের স্ত্রী উম্মে হাবিবা বলেন, ‘আমার স্বামী মাদরাসাটির শিক্ষক ছিলেন এবং মসজিদে ইমামতি করতেন। সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে মাদরাসায় ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা সবাই আরসার লোক। এর আগেও একাধিকবার তারা আমার স্বামীকে হুমকি দিয়েছিল। ’

নিহত নুর হালিমের স্ত্রী উম্মে হাবিবা বলেন, ‘আমার স্বামী মাদরাসাটির শিক্ষক ছিলেন এবং মসজিদে ইমামতি করতেন। সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে মাদরাসায় ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা সবাই আরসার লোক। এর আগেও একাধিকবার তারা আমার স্বামীকে হুমকি দিয়েছিল। ’

গতকাল সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ, অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছু দৌজা চৌধুরী, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিকারুজ্জামান চৌধুরী, ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক নাঈমুল হক, ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক শিহাব কায়সার খান।

জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য ক্যাম্প প্রশাসন আরো কঠোর অবস্থানে থাকবে।

অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছু দৌজা বলেন, একদল দুর্বৃত্তের হামলায় ছয় রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।