ইতিহাস

ট্যাটু আর্ট: ইসলাম যা বলে

  Mahbub ৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ১১:৩৮ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের শরীরের চামড়ায় মোট সাতটি স্তর থাকে। এর মধ্যে দ্বিতীয় স্তরের চামড়ায় সুঁই বা এজাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ক্ষত করে তাতে বাহারি রং দিয়ে নকশা করাকে উল্কি বা ট্যাটু বলে। বর্তমান বিশ্বে কিছু কিছু বিপথগামী তরুণ-তরুণী পশ্চিমা আগ্রাসনের শিকার হয়ে শরীরে এসব ট্যাটু আঁকছে। তারা শরীরের পাশাপাশি মুখ, কানসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানেও ট্যাটু করতে দ্বিধা বোধ করছে না। তবে ইসলামে এ ট্যাটু আর্টকে সম্পূর্ণরুমে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকছে আওয়ার ইসলামে। ‘ট্যাটু আর্ট: ইসলামে কেন হারাম?’ এ বিষয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।


রাজধানীর ধানমন্ডি-২ এর একটি ভবনে ট্যাটুর কাজ করেন সাঈদুর রহমান। ইসলামে ট্যাটু করা হারাম এটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তারপরও তিনি এ কাজ করে যাচ্ছেন। জেনে শুনে কেনো করছেন হারাম কাজ?-এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই কত শত গুনাহ করছি, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত। মিথ্যা বলা মহাপাপ তবু মিথ্যা বলি। সিগারেট খেলে মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে, সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে তবুও খাচ্ছি। এই কথাটি বলছি বলে ভাববেন না, ট্যাটু করাকেও আমি সমর্থন করছি। শুধু বোঝাতে চাইছি-প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে পছন্দ ও অপচ্ছন্দ রয়েছে। কারও কাছে ট্যাটু করা পছন্দ না, আবার কারো কাছে পছন্দের। তাই আমি এটা করছি।’

শুধু সাঈদুর রহমানই না। রাজধানীর কিছু কিছু স্থানে এসব হারাম কাজ চালু রয়েছে। কোথাও প্রশাসেনের অনুমোদন নিয়ে করা হচ্ছে। আবার কোথাও অনুমোদ ছাড়া লুকিয়ে লুকিয়ে তরুণ-তরুণীদের বিপদগামী করছেন কিছু মানুষ। প্রত্যেকের এমন কিছু খাড়া যুক্তি রয়েছে। তবে যত যুক্তিই দাড় করাক! ইসলামে কখনো ট্যাটু আঁকা হালাল নয়।

ইসলামে ট্যাটু আঁকা হারাম যে কারণে: নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ট্যাটু (বাংলায় যাকে উল্কি বলা হয়) আঁকতে তথা শরীরে খোদাই করতে নিষেধ করেছেন। এতে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতির পরিবর্তন হয়।

নবিজী যা করতে নিষেধ করেন মোমিনদের জন্য তা করা হারাম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, যদি তুমি কুরআন পড়তে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি? রাসূল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা তোমাদের নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।

ট্যাটু আঁকা নিষেধের বিষয়ে হাদিস : আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেন, যেসব নারী নকল চুল ব্যবহার করে এবং যারা অন্য নারীকে নকল চুল এনে দেয়, যেসব নারী উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, রাসুল সা. তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।’ (বুখারি শরীফ, হাদিস : ৫৫৯৮, মুসলিম শরীফ, হাদিস : ৫৬৯৩)

হজরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেন, ‘যেসব নারী সৌন্দর্যের জন্য উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে, যেসব মহিলা ভ্রু উৎপাটন করে এবং দাঁত ফাঁকা করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের অভিসম্পাত করেছেন।’ (বুখারি শরীফ, হাদিস : ৫৬০৪)

এমন আরও একটি হাদিস মুসলিম শরিফে এসেছে যেটা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি যার সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়।’ (আবু দাউদ শরীফ, হাদিস : ৪০৩১)

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামোয়। (সূরা তীন, আয়াত: ৪) মানুষকে সর্বোত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কথার মানে হচ্ছে এই যে তাকে, এমন উন্নত পর্যায়ের দৈহিক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে। যা অন্য কোনো প্রাণীকে দেয়া হয়নি। তাকে এমন উন্নত পর্যায়ের চিন্তা ,উপলদ্ধি জ্ঞান ও বুদ্ধি দান করা হয়েছে, যা অন্য কোনো সৃষ্টিকে দেয়া হয়নি।

তাই স্বাভাবিক শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে শরীরে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। সুতরাং মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহ ও তার রাসূল সা. এর আদেশ পালন করা। আর আমাদের রাসূল সা. যেহেতু ট্যাটু লাগাতে নিষেধ করেছেন, তাই মোমিনদের অবশ্যই ট্যাটু লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

মোদ্দাকথা, শখের বসেই হোক কিংবা ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে হোক আল্লাহর সৃষ্টিতে হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন করে উল্কি-ট্যাটু ইত্যাদি আঁকা হারাম। তবে যদি চিকিৎসার জন্য ট্যাটু আঁকার বাস্তবিক প্রয়োজন পড়লে ও অন্য কোনো উপায় না থাকলে তা বৈধ হবে।

উল্কি বা ট্যাটু শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ তা নয়; বরং বিভিন্ন ক্ষতিকর দিকের পাশাপাশি বেশ কিছু শারীরিক অসুবিধা ও সমস্যাও এতে তৈরি হয়।

উল্কির কারণে অজু-গোসলে অসুবিধা: উল্কির কারণে চামড়ায় পানি পৌঁছাতে যদি বাধার সৃষ্টি হয়, তাহলে অজু আদায় হবে না। আবার ফরজ গোসলও সম্পন্ন হবে না। ফলে সব সময় অপবিত্র শরীর বয়ে বেড়াতে হবে।

উল্কি আঁকানোর অপকারিতা : শরীরে উল্কি আঁকানোর বৈজ্ঞানিক কোনো উপকারিতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। উল্টো উল্কি ব্যবহারে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে। হেপাটাইটিস, টিউবারকিউলোসিস, টিটেনাসের মতো ইত্যাদি রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উল্কির রং ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ উল্কি আঁকার রাসায়নিক পদার্থ চামড়ার ভেতরের স্তরে প্রবেশ করে। আর যেহেতু এই উল্কি সারা জীবন শরীরে থাকবে, তাই ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থও সারা জীবন দেহে থেকে যাবে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুখ এমনকি ক্যানসারও হতে পারে।